একটি সমাজে সম্পদ ও ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হলে আজ হোক বা কাল, সেই সমাজ ভেঙে পড়েই বলে মন্তব্য করেছেন
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেছেন, ‘সম্পদের বণ্টন না হলে সমাজ টিকিয়ে রাখা মুশকিল হয়ে পড়ে।’
বৃহস্পতিবার থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে বিমসটেক ইয়াং জেনারেশন ফোরামে দেওয়া বক্তব্যে অধ্যাপক ইউনূস এসব কথা বলেন।
ক্ষুদ্রঋণ সৃষ্টি, সামাজিক ব্যবসা উদ্ভাবন ও দারিদ্র্য বিমোচনে ভূমিকায় রাখায় নোবেল শান্তি পুরস্কার অর্জনকারী অধ্যাপক ইউনূস বিমসটেক সম্মেলনে যোগ দিতে দুই দিনের সফরে এখন ব্যাংকক রয়েছেন।
ফোরামে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে ড. ইউনূস বলেন, ‘লোভ-লালসায় প্রভাবিত হয়ে কোনোভাবেই ব্যবসা পরিচালনা করা যাবে না। নতুন সভ্যতার এটাই প্রথম শর্ত।’
‘লোভ আমাদের ধ্বংস করে দেবে। কারণ যদিও আমরা সরকারকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি যে আমরা এটা-সেটা করছি। আমাদের দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, জিডিপি বাড়ছে এবং প্রবৃদ্ধির হার এত বেশি। কিন্তু বাস্তবে তার কতটুকু হচ্ছে? দেশের সম্পদ গুটিকয়েক মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে যাচ্ছে। তারা ধনী থেকে আরও ধনী হচ্ছে, আর আমরা এটাকে বলছি উন্নয়ন। এটাকে আমরা বলি প্রবৃদ্ধি, চমৎকার অর্থনীতি। আর এভাবেই আত্মবিনাশের বীজ রোপিত হয়।’
এই একটিমাত্র কারণে সভ্যতা টিকতে পারে না; আমাদের গ্রহকে তারা ধ্বংস করছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বিশ্বকে বদলে দেওয়ার জন্য প্রচলিত এই ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা। বলেন, ‘একই পদ্ধতি দিয়ে আপনি নতুন বিশ্বব্যবস্থা গড়তে পারবেন না। আপনি যদি সত্যিই বিশ্বে পরিবর্তন আনতে চান, তবে পদ্ধতিগত পরিবর্তন জরুরি; এটি ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।’
উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘একটি নির্দিষ্ট রাস্তা দিয়েই বারবার এগোতে থাকলে প্রতিবার আপনি একই গন্তব্যে পৌঁছাবেন। ভিন্ন গন্তব্যে পৌঁছাতে চাইলে অবশ্যই নতুন রাস্তা দরকার।’
এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘এখনকার তরুণ প্রজন্ম একেবারেই আলাদা। আমি তরুণ প্রজন্মের কাছে বারবার বলি, তোমরাই মানব ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রজন্ম।’
‘অথচ এই শক্তিশালী প্রজন্মটিকে আপনি অন্য কারও কাজে লাগাচ্ছেন, অন্যদের থেকে আদেশ নিচ্ছেন।’
ঋণ প্রাপ্তির গুরুত্ব তুলে ধরে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘ঋণের অধিকার প্রতিষ্ঠা না করা পর্যন্ত আপনি সব অধিকার অর্জন করতে পারবেন না। যে মুহূর্তে আপনার ঋণের অধিকার প্রতিষ্ঠা হবে, সেই মুহূর্ত থেকেই অন্যান্য অধিকারগুলো জনগণ নিজেরাই প্রতিষ্ঠিত করবে; সেগুলো বাইরে থেকে আনতে হবে না।’
পৃথিবীকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষায় নিজেদের ‘তিন শূন্যধারী ব্যক্তি’ (থ্রি-জিরো পারসন) হিসেবে গড়ে তুলতে তরুণ প্রজন্মের প্রতি আহ্বান জানান নোবেলজয়ী এই অধ্যাপক।
তিনি বলেন, ‘আমরা যদি সেবা দিতে চাই, তাহলে আমাদের তিনটি শূন্যের নতুন সভ্যতার দিকে ধাবিত হতে হবে—শূন্য কার্বন নিঃসরণ, শূন্য বর্জ্য ও শূন্য সম্পদ কেন্দ্রীকরণ।’
‘কার্বন নিঃসরণ, বর্জ্য সৃষ্টি ও সম্পদ কেন্দ্রীকরণের পুরনো অর্থনৈতিক মডেলের প্রয়োগ অব্যাহত থাকায় বিশ্ব একটি আত্মঘাতী সভ্যতার দিকে এগোচ্ছে।’ সমাজে টিকে থাকতে হলে প্রকৃতি রক্ষার বিকল্প নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এ সময় নতুন প্রজন্মকে উদ্যোক্তা হওয়ার আহ্বান জানিয়ে ড. ইউনূস বলেন, ‘মানুষ অন্যের অধীনে কাজ করার জন্য জন্মায় না, উদ্যোক্তা হওয়ার জন্যই তার জন্ম।’
শুরুতে বড় পরিসরে ব্যবসা শুরুর পরিবর্তে তরুণদের ক্ষুদ্র পরিসরে ব্যবসা চালু করার পরামর্শ দেন তিনি। বলেন, ‘শুরুতে বড় পরিসরে ব্যবসা চালু করা ভুল পথ। তুমি একবারে রাতারাতি সবকিছু পরিবর্তন করতে পারবে না। তাই ছোট পরিসরে শুরু করে পরিবর্তনের সূচনা কর।’
সবার জন্য টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে তরুণদের সামাজিক ব্যবসায় যুক্ত হওয়ার পরামর্শ দিয়ে তার আহ্বান, ‘যদি পরিবর্তন চাও, তাহলে নিজের গ্রাম থেকেই শুরু কর।’
ব্যাংককে বঙ্গোপসাগরীয় দেশগুলোর আঞ্চলিক সহযোগিতা জোটের (বিমসটেক) ষষ্ঠ শীর্ষ সম্মেলন চলছে। শুক্রবার সম্মেলনের শেষের দিন থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে বিমসটেকের পরবর্তী চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। আগামী দুই বছর বাংলাদেশ এই জোটের নেতৃত্ব দেবে। ২০২২ সালের ৩০ মার্চ পঞ্চম শীর্ষ সম্মেলনে শ্রীলঙ্কার কাছ থেকে বিমসটেকের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছিল থাইল্যান্ড।